বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে। আর্থিক বিভিন্ন সূচকের উন্নতি ঘটেছে। কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। উন্নয়নের সুবিধা দেশের সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছেনি। ফলে দেশের অর্থনীতির আকার বড় হলেও জনসংখ্যার একটি অংশ পেট ভরে খেতে পারে না। এ সংবাদ দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনিক নীতিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে গত বছরের চেয়ে তিন ধাপ অবনমন হয়েছে বাংলাদেশের। সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুসারে ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। সব মিলিয়ে দেশে ক্ষুধা নিরাময় এখন বড় উদ্বেগের জায়গায় দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ববাসীর মধ্যে ক্ষুধার প্রকোপ কতখানি, তা জানতে প্রতি বছর বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক প্রকাশ করা হয়। কোন দেশে কত মানুষ এখনো ক্ষুধা আক্রান্ত, তা প্রকাশ করাই এর কাজ। এ সূচকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বরাবরই সর্বাধিক ক্ষুধা আক্রান্ত বলে উঠে এসেছে। এ বছরের ক্ষুধা সূচক বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষুধার মাত্রা গুরুতর, কারণ এ অঞ্চলে রয়েছে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অপুষ্টি। আর বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার কারণ হিসেবে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, ঋণ সংকট ও বৈষম্যকে দায়ী করা হয়েছে।
প্রতি বছর বৈশ্বিক ক্ষুধাসংক্রান্ত সূচকের মাধ্যমে এর পরিমাপ নির্ণয় করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এ প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো অপুষ্টি সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং যাতে সংশ্লিষ্ট দেশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। সার্বিকভাবে বলা যায়, ক্ষুধার বৈশিষ্ট্য বহুমুখী, যা একমাত্র অনাহারজনিত ক্ষুধাকেই বোঝায় না। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য বা সূচক হলো এক. পুষ্টির অভাব; দুই. শিশুদের পরিমাণ অনুযায়ী ওজনের ঘাটতি; তিন. খর্বাকার শিশু এবং চার. শিশুমৃত্যুর হার। পুষ্টির অভাবের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, মোট জনসংখ্যার পুষ্টির ঘাটতির শতকরা হার, শতকরা কতটি শিশুর ওজন কম, শতকরা কতটি শিশু খর্বাকৃতির এবং শিশুমৃত্যুর শতকরা হার। এ ধরনের সূচক ব্যবহার করার বহু সুবিধা রয়েছে। এসব সূচক দিয়ে একমাত্র পুষ্টির অভাব সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে শিশুদের অপুষ্টি ও তার ফলাফল সম্পর্কেও জানা যায়। শিশুদের জীবন অপুষ্টির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এর ফলে তারা সহজেই নানা রকম রোগের শিকার হয়। সহজে রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব। এ বিষয় জানতে পারলে এর কুফলও রোধ করা সম্ভব।
নীতি প্রণয়ন করতে হলে ক্ষুধা নিবারণের নীতি ও অপুষ্টি প্রতিরোধের নীতি বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। অপুষ্টির কারণ অনেক, ক্ষুধা অপুষ্টির একমাত্র কারণ নয়। বাংলাদেশে অপুষ্টির বিস্তার ব্যাপক। মধ্যবিত্ত ও ধনী পরিবারেও শিশুদের অপুষ্টি কিংবা নারীদের রক্তস্বল্পতা দেখা যায়। তাই অপুষ্টি দূর করতে হলে কেবল ক্ষুধা নিবৃত্তির কথা ভাবলেই চলবে না। শিশুর পরিবার কীভাবে তাদের যথেষ্ট পরিমাণে সুষম খাবার খাওয়াতে পারে, তার জন্য নানা উপায় চিন্তা করতে হবে। কিন্তু ক্ষুধাজনিত অপুষ্টির হারও যে কম নয়, তা ক্ষুধা সূচক সমীক্ষায় প্রতি বছর প্রকাশ হচ্ছে। এক্ষেত্রে কিন্তু সংখ্যা অপেক্ষাও বড় তাৎপর্য মানবাধিকারের। খাদ্যে সব মানুষেরই অধিকার রয়েছে, তা জীবনের অধিকারেরই অন্তর্গত। ক্ষুধা নিবারণের নীতি স্থির করতে হবে এ উদ্দেশ্যে, একজনও যেন ক্ষুধার্ত না থাকে এবং সুষম খাবার পায়।
সর্বজনীন উন্নয়ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। উন্নয়নের বাইরে থাকা মানুষদের সম্পদে ও আয়ে অধিকার কমছে, যার প্রমাণ বৈষম্য সূচকে বাংলাদেশের ঊর্ধ্বগতি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রকাশিত গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে গত এক বছরে অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্য সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নারী-পুরুষ বৈষম্য আরো প্রকট হয়েছে, আর তার ফল হয়েছে বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতা সূচকে বড় অবনমন। বার্ষিক এ সূচকে গত বছরের তুলনায় ৪০ ধাপ নেমে গিয়ে ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এবার ৯৯তম স্থানে ঠেকেছে। অন্যদিকে প্রশাসনিক যেটুকু উন্নয়ন পৌঁছে দেয়া যেত, তা-ও দুর্নীতি, পরিকাঠামোর অভাব ইত্যাদি কারণে যায়নি। অধিকারভিত্তিক পুনর্বণ্টন, নাকি কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে যোগ দেয়ার পথ খুলে দেয়া—উন্নয়ন কোন পথে আসবে, নাকি দুটি পথই জরুরি, এ তর্ক জারি রাখা জরুরি। ক্ষুধা ও অপুষ্টির হার খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আফ্রিকার কিছু দেশে গবেষণা করে দেখা গেছে, যে স্কুলে ছাত্রদের নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে, সে স্কুলের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি সুস্থ। বাংলাদেশে অপুষ্টি নিয়ে যতটুকু ভাবা হয়, তা সচরাচর খাদ্যের বাইরে পৌঁছতে পারে না। শুধু আয় বাড়ালেই উন্নয়ন হবে না, সেই আয় বৃদ্ধির সুফল পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বটে, তবে অপুষ্টির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখনো যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। দেশের বিদ্যমান অপুষ্টিচিত্রের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কোনো উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে টেকসই অবদান রাখতে হলে ঝুঁকির মধ্যে থাকা পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোকে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়নের অংশীদার করতে হবে। এক্ষেত্রে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্তকরণের জন্য নেয়া সরকারি-বেসরকারি কর্মসূচির পর্যালোচনাও দাবি রাখে।